বুক রিভিউঃ ‘ত্রিশ লক্ষ শহিদ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা’ – আরিফ রহমান

পড়ছি- ‘ত্রিশ লক্ষ শহিদ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা’ – আরিফ রহমান। অজস্র পেপার কাটিং আর দেখা-অদেখা ছবি, তথ্য প্রমানের এক অমূল্য আর বিরল রত্ন এই বই। স্বাধীনতা বিরোধী আর সরাসরি জামায়াত ইসলামি’র সমর্থক,নেতা-কর্মী, সংগঠক কিংবা তাদের মত অনুসারীদের গালে ‘ক্রস ক্রস’ করে থাপ্পর এই বইটা। ‘এই কাদের মোল্লা সেই কাদের মোল্লা না’ মূলত এই প্রোপাগান্ডা’র উত্তর দিতে গিয়ে অনলাইন আর অফলাইনে আরেকটা প্রসঙ্গ চলে আসত, আর তা হল ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত শহিদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ নয় বরং তা তিনলাখ’ !

শুরুতে মৌলবাদীদের হাতে নিহত অভিজিৎ রায়, ভাস্কর বীরাঙ্গনা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী, শহিদ সন্তান নুজহাত চৌধুরীর বক্তব্য মুখবন্ধ আকারে রয়েছে। একদম প্রথমেই দেখতে পাই কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতা ‘রিপোর্ট ১৯৭১’। এই কবিতাটি অত্যন্ত সতর্কভাবে এইখানে দেয়া হয়েছে যেন রেফারেন্স হিসেবে দেয়া যায়। কবিতার কয়েকটি লাইন এই বইয়ের মূল ভাবনার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এরপর পাই এখনকার সবচাইতে জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের একজন শাবিপ্রবি’র শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভূমিকা, উঁনি উচ্ছ্বসিতভাবে আরিফ রহমানের প্রশংসা করেছেন এই উদ্যাগ নেয়ার জন্য , বরাবরের মত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই প্রজন্ম নিয়ে। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটা ভূমিকা লিখেছেন জাফর স্যার, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে যে অপপ্রচার তা নিয়ে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন আবার পরক্ষনেই আশাবাদী হয়েছেন।

লেখক আরিফ রহমান ভূমিকাতেই লিখেছেন ‘আমাদের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও স্বাধীনতার অনেক মৌলিক প্রশ্নে আমরা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারিনি’। আমার মতে, এইখানে আসলে দুর্ভাগ্যের কিছু নাই। স্বাধীনতার পরপরই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যেখানে ঐক্যমত সৃষ্টির কোন প্ল্যাটফর্ম তৈরী হয় নাই বরঞ্ছ শাসকগোষ্ঠী নানা ক্ষেত্রে আপোস করেছে স্বাধীনতার মৌলিক প্রশ্নে, যাই হোক সেইটা ভিন্ন আলাপ এবং এইগুলা নিয়ে ভবিষ্যতে আশা করি আরো খোলামেলা আলোচনা কিংবা উপসংহার টানা হবে। আমাদের নয় মাস যুদ্ধের পর কেন এত এত কনফিউশন, একেক জনের ভূমিকা কেন এত প্রশ্নবিদ্ধ তার উপসংহার কেউ টানতে পারে নাই আজ পর্যন্ত, এইসকল রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারবেনা এবং উপসংহার না টানা পর্যন্ত বিতর্ক আমাদের পিছ ছাড়বেনা।

এইবার আসি মূল আলোচনায়। বঙ্গবন্ধুর ‘থ্রি লাখ থেকে থ্রি মিলিয়ন’ জবানগত ভুল , এই অপপ্রচারের উত্তর এইখানে প্রমান সহ দেয়া হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার আগেই দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে তিরিশ লাখ শহিদের খবর, যোগ করেছেন অপ্রকাশিত অনেক পেপার কাটিং। সাথে যোগ করেছেন বিদেশি জার্নাল, পরিসংখ্যান, বিভিন্ন গবেষনাপত্রের তথ্যাদি, উপাত্ত, খবর-রিপোর্ট। সব মিলিয়ে যা প্রমান করে ত্রিশ লক্ষ সংখ্যাটা কোন স্বপ্নে পাওয়া বিষয় না, রূঢ় বাস্তব সংখ্যা। শুধু শহিদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির জবাব দিয়ে আরিফ রহমান ক্ষান্ত দেন নাই-শেষে আলোচনা করেছেন;সাজাপ্রাপ্ত রাজাকারদের বিচার প্রক্রিয়ার সময় চলতে থাকা প্রোপাগান্ডা ও তাঁর জবাব দিয়েছেন পয়েন্টে পয়েন্টে।

এই বইয়ে অনেক ধাক্কা দেয়ার মত তথ্য আছে। একটার কথা বলে লেখা শেষ করি। বিবিসি’র বাংলা বিভাগের সাবেক উপ প্রধান জনাব সিরাজুর রহমানের একটা চিঠি প্রকাশ করে ডেইলি গার্ডিয়ান ২০১১ সালে, যার শিরোনাম ছিল – ‘ মুজিব’স কনফিউশন অন বাংলাদেশি ডেথস’ – বলাই বাহুল্য এইটা একটা প্রোপাগান্ডামূলক লেখা (চিঠি)। ভদ্রলোকের দাবি ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে আসার পর উনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎকারী প্রথম বাংলাদেশী, উনি কথপোকথনের মাঝে বলেন- ” During the day I and others gave him (Sheikh Mujib) the full picture of the war. I explained that no accurate figure of the causalities was available but our estimate based on information from various sources was that up to three lakhs , 300000 died in the conflict.’ আমি এই বক্তব্য ‘কনফ্লিক্ট’ শব্দে ভাল একটা ধাক্কা খেলাম, ‘WAR’ ব্যবহার না করে ‘Conflict’ ব্যবহার ব্যাপারটা ঠিক মুক্তিযুদ্ধ না বলে সিভিল ওয়ার বা গন্ডগোল বলাটার সমার্থক। এই লোকের মনোভাব এই শব্দেই স্পষ্ট। নানারকম অসত্য ভরপুর এই চিঠিতে উনি দাবি করেছেন উনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছেন। যা ডাহা মিথ্যা কথা, আমরা এখন ইউটিঊব সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর পাশে জনাব কামাল হোসেনকে প্রেস কনফারেন্স কাভার করতেছেন লন্ডনে, বঙ্গবন্ধুর চুল একটু অপরিপাটি, মুখে পাইপ। সেদিন ফ্লাইটে বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী ছিলেন কামাল হোসেন। এই চিঠির উচিত জবাব দেন লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রাশেদ চৌধুরী। রাশেদ চৌধুরীর বক্তব্যের সার সংক্ষেপ হল এই- কামাল হোসেন থাকতে বঙ্গবন্ধুর কেন সিরাজুর রহমানের কাছ থেকে যুদ্ধের হতাহতের খবর পেতে হবে যেখানে কামাল হোসেন উনার সাথে ভ্রমন করেছেন শুরু থেকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s